স্বপ্নিল স্পর্শ
- Jun 7, 2017
- 3 min read

কাল রাত থেকে রোহানের ঘুম নেই ।সকাল হলেই জন্মদিনের নিমন্ত্রন ।এতো বড়লোকের বাড়িতে সে যে কোনোদিন ঢুকতে পারবে সেটাই বুঝতে পারেনি ।নেহাত মা ওদের বাড়ির বাচ্চাটাকে একদিন অটোর সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে এক্সিডেন্টের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলো তাই ওরা মাকে মনে রেখেছে । কাল ওদের বাড়ির ড্রাইভার এসে রোহান আর রোহানের মাকে নিমন্ত্রন করে গেছে । ইস !হঠাৎ বাবার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো ... বাবা খাবে না ! বাবার তো নিমন্ত্রন নেই ওদের বাড়িতে !! ছুট্টে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে রোহান বললো ,বাবা তোমাকে কেন নিমন্ত্রন করলো না ? একটু হেসে সুখেন বললো , তুই আনন্দ পেলেই আমার পাওয়া ।আমি তো প্রায়ই কত নিমন্ত্রন বাড়িতে খাই । রোহানের মনে পড়ে গেলো ,বাবার সাথে একদিন জন্মদিনের বাড়িতে যাবে বলে ও খুব বায়না ধরেছিল ।মা বুঝিয়ে বলেছিলো ,ওইখানে শুধু নাকি বাবারই নিমন্ত্রন আছে । বাবা সেদিন পলিথিনের প্যাকেটে করে একটা ইয়া বড় পেটে কাঠিভরা চিংড়ি মাছ এনেছিল রোহানের জন্য । অতবড় চিংড়ি তো রোহান লম্বা দাঁড়ার করতালেই পড়েছে । যাইহোক ,রোহান নিজের সব থেকে ভালো জামাটা পরবে আজ ।সেই যেটা গতবার পুজোয় মেজমাসি দিয়েছিলো ।মা বলেছিলো , এটা নাকি মাসির ছেলের ছোট হয়ে যাওয়া জামা ।কিন্তু তবুও বুকের মধ্যে ঐ ছোটা ভীমের লাড্ডু খাওয়ার ছবিটা দেখলেই রোহানের নিজেকে শক্তিশালী মনে হয় ।
ওর তো সেরকম দামি জামাই নেই । কথাটা মনেপড়েই জিভ কাটলো রোহান ।মায়ের শাড়ির ট্রাঙ্কটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওর । বিট্টুর মায়ের কত শাড়ি !আর ওর মায়ের ন্যাপথলিন দেওয়া ট্রাঙ্কে হাতে গোনা কটামাত্র শাড়ি। ছোট্ট মনে বেশিক্ষন কষ্ট স্তব্ধ হয়ে থাকে না । রোহান ভাবছিলো ,বড়লোকের জন্মদিনের কেকটাও অনেক বড় হয় ।ওদের বাড়ির মুনিয়া তো মাত্র পাঁচ বছরের ।ও কি বুঝবে জন্মদিনের !!হাজার প্রশ্নের ভিড়েই সময় কেটে গেলো । সন্ধ্যে হতেই রোহান অস্থির করছে ,মা চলো ,মা চলো .... একটা খামের মধ্যে মা পঞ্চাশ টাকা ভরেছে ,মুনিয়াকে গিফ্ট দেবে বলে ।আজকাল নাকি পঞ্চাশ টাকায় কিনতে গেলে আর কিছুই হয়না ।মা যখন বাবাকে বলছিল তখন শুনেছে রোহান ।কে বলল হয়না ,সেদিনই তো স্কুলে শুভম একটা পেন্সিল বক্স এনেছিল ,বেনটেনের ছবি দেওয়া ।দাম বললো ...পঞ্চাশ টাকা ।খুব ইচ্ছে করছিল একটা কিনতে ...কিন্তু ... অভাব সবাই বোঝে ।নিম্নমধ্যবিত্তের সংসারের ফাঁকা নুন ,তেলের কৌটোটা পর্যন্ত বিদ্রোহ করে না ।বুঝতেই পারে ,শেষ হয়েছে যখন তখন কদিন ফাঁকাই পরে থাকবে হয়তো । বাবা অনেক আগেই কাজে বেরিয়ে গেছে ।মা ঘরের কাজ করে যাচ্ছে এখনো ।রোহান নতুন জামা পরে অধৈর্য্য হয়ে তিড়িংবিড়িং করে চলেছে । অবশেষে মায়ের হাত ধরে রোহান চললো ,মুনিয়ার জন্মদিনে। দূর থেকেই ওদের লজের লাইটের গেটটা দেখতে পেলো রোহান । মায়ের হাতটা উত্তেজনায় চেপে ধরলো একটু । মা বললো ,ওদের ওখানে গিয়ে বেশি কথা বলবে না ।কেউ যদি জিজ্ঞেস করে দুপুরে কি খেয়েছো তাহলে বলবে ভাত খেয়েছি ।ভাতের সাথে কি কি ছিলো বলার দরকার নেই । আর একদম দুস্টুমি করবে না । মা যেন কেমন !ভাতের সাথে কলমি শাক ,আলুসিদ্ধ আর ডাল ছিল, সেটা না বলার কি আছে !! বিশাল গেটের সামনে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ।মুনিয়াকে একটা সুন্দর চেয়ারে বসানো হয়েছে । একটা বিশাল জোকার সকলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চকলেট দিচ্ছে ,হ্যান্ডশেক করছে । রোহান মায়ের হাত ছাড়িয়ে চলে গেলো জোকারের সামনে ...জোকারটা রোহানের হাতেও একটা চকলেট দিলো ।কি আশ্চর্য !রোহানের পছন্দের স্ট্রবেরি ফ্লেবারের । কিন্তু জোকারটার কি রোহানকে পছন্দ নয় ?ওর বাড়ানো হাতে হ্যান্ডশেক করলো না বা ওর মাথায় হাতও বুলিয়ে দিলো না । হয়তো জোকারটাও জেনে গেছে ওরা গরিব ! মুনিয়ার মা মায়ের হাত ধরে বলল ,দিদি সেদিন তুমি না থাকলে আমার মুনিয়ার যে কি হতো ? এতো সুস্বাদু খাবার রোহান জীবনে মাত্র দু একবারই খেয়েছে । মুনিয়া একটা দারুন ফ্রক পরে পুতুলের মত ঘুরছে। বড্ড সাহসী মেয়েটা ,মাঝে মাঝেই ঐ জোকারটার লাঠি কেড়ে নিয়ে ওর পিঠে গিয়ে মেরে আসছে । ওর ছেলে মানুষী দেখে নিমন্ত্রিতরা সকলে হাসছে । রোহানের কিন্তু খারাপ লাগলো , এটা ভেবেই যে বাচ্চা হোক আর যাই হোক লাঠি দিয়ে যখন মারছে তখন প্রতিবারই জোকারের লাল রং মাখানো ঠোঁটটা কুঁচকে যাচ্ছে । লাফাতে লাফাতে হাতে চকলেট নিয়ে মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে এলো রোহান । রাতে ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখলো ,হাজার হাজার রঙিন বেলুনের মধ্যে রোহান শুয়ে আছে ।ঘুমটা ভাঙতেই দেখলো বাবা পাশে শুয়ে আছে । বাবা বোধহয় রাত করে ফিরেছে কালকে ,রোহান ঘুমিয়ে গিয়েছিলো তখন । জন্মদিনের কোনো গল্পই করা হয়নি ।বিশাল ক্রিকেট মাঠের যে কেকটা দেখেছে সেটাও বলা হয়নি বাবাকে । জানো বাবা,কাল ওদের বাড়িতে পাতায় মুড়িয়ে যে মাছটা ... কথা শেষ না করতে দিয়েই বাবা বললো ,ওটা ভেটকি মাছের পাতুরী ।দারুন খেতে হয়েছিল, বল ? রোহান বললো ,তুমি কি জানলে ? সুখেন ঢোক গিলে বললো ,আমি তো কত বিয়ে বাড়িতে খাই ,দারুন হয় । রোহানের গল্পের বন্যায় ভাসছে ওদের ছোট্ট ঘরের বদ্ধ হাওয়াটা । গল্পে কেক ,আইসক্রিম থেকে জোকার পর্যন্ত বর্ণনা করে চলেছে রোহান । শুধু সুখেনই জানে কেন রোহানকে কালকে জোকারটা হ্যান্ডশেক করেনি। হয়তো এতদিনের চেনা স্পর্শটা চিনে ফেলতো রোহান । হয়তো সকলের সামনে চেঁচিয়ে বলে ফেলতো ,বাবা ....







Comments